মানুষের চোখের বিবর্তন: কিভাবে একটি এক চোখের প্রাণী আমাদের পূর্বপুরুষ হয়ে উঠল? | মানুষের চোখের রহস্য: আমরা 600 মিলিয়ন বছর আগে এক চোখ বিশিষ্ট একটি প্রাণী থেকে বিবর্তিত হয়েছি
600 মিলিয়ন বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষ কেমন ছিলেন?
- প্রায় 600 মিলিয়ন (60 কোটি) বছর আগে, আমাদের পূর্বপুরুষ একটি ছোট পোকামাকড়ের মতো প্রাণী ছিল। এটি সমুদ্রের গভীরে বাস করত এবং জল থেকে প্লাঙ্কটন ফিল্টার করে পেট ভরত।
- আশ্চর্যের বিষয় হলো এই প্রাণীটির জীবনযাপন ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ। তিনি এমন এক প্রাণী ছিলেন যিনি এক জায়গায় অবস্থান করেছিলেন। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে এই সময়ের আগে সম্ভবত এই প্রাণীটির দুটি চোখ ছিল।
- কিন্তু এর জীবনধারা আসীন হয়ে পড়ায় শিকার বা বেঁচে থাকার জন্য দুই চোখের প্রয়োজন অনুভব করে না। ফলে বিবর্তনের সময় তিনি তার দুটি চোখ হারিয়েছিলেন।
মাথার মাঝখানে যে একক চোখ তৈরি হয়েছিল কীভাবে?
এই প্রাণীটি যখন তার জোড়া চোখ হারিয়েছিল, তখন একদল আলো-সংবেদনশীল কোষ তার মাথার মাঝখানে থেকে যায়। এই দলটি একটি আদিম ‘মধ্য চক্ষু’ অর্থাৎ মাথার মাঝখানে একটি চোখ রূপ নিয়েছে।
এই টিকটিকিটির মাথার মাঝখানে হালকা দাগটি মধ্যম চোখ তৈরি করে। ছবিটা পেছন থেকে তোলা হওয়ায় প্রাণীটির নিয়মিত চোখ দেখা যায় না। (চিত্র ক্রেডিট: ব্রুনো ফ্রিয়াস মোরালেস/ই-ন্যাচারালিস্ট/ক্রিয়েটিভ কমন্স)
এই চোখ আজকের চোখের মতো পরিষ্কার ছবি দেখতে না পারলেও দিন-রাতের পার্থক্য খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারত।
এই একমাত্র চোখের সাহায্যে সেই প্রাণীটি জানতে পেরেছিল কী উপরে আর কী নীচে। এটি ছিল এক ধরনের প্রাকৃতিক সেন্সর যা সমুদ্রের অন্ধকারে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল।
মানুষের চোখের যাত্রা আবার কিভাবে শুরু হলো?
- লক্ষ লক্ষ বছর পরে, আমাদের পূর্বপুরুষরা আবার একটি সক্রিয় জীবনধারা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সাঁতার কাটা এবং সমুদ্রে শিকার শুরু করেন। এখন তার এমন চোখ দরকার যা স্পষ্ট দেখতে পারে এবং দূরত্ব বিচার করতে পারে।
- গবেষণা এটি বলে যে একই মধ্যম চোখের অংশ থেকে আবার দুটি নতুন চোখ তৈরি হয়েছে। এই কারণেই মানুষের চোখ কীটপতঙ্গ বা স্কুইডের চোখ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
- অধ্যাপক নিলসন ব্যাখ্যা করেছেন যে আমাদের চোখের রেটিনা মস্তিষ্কের একটি অংশ থেকে বিকশিত হয়েছে। অন্যদিকে, পোকামাকড়ের চোখ তাদের মাথার পাশের চামড়া দিয়ে তৈরি।
জীবনধারায় ঘন ঘন পরিবর্তনের কারণে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের চোখ অনন্য হয়ে উঠেছে। (গ্রাফিক ক্রেডিট: বর্তমান জীববিজ্ঞান (2026)। DOI: 10.1016/j.cub.2025.12.028)
পিনিয়াল গ্রন্থি এবং মস্তিষ্কের ‘তৃতীয় চোখের’ মধ্যে সংযোগ কী?
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হল আমাদের একচোখা পূর্বপুরুষের সেই চোখটি এখনও আমাদের শরীরে বিদ্যমান। বিবর্তনের ধারায় সেই চোখ মুখ থেকে সরে গিয়ে মস্তিস্কের অভ্যন্তরে গিয়ে ‘পাইনিয়াল গ্ল্যান্ড’-এ পরিণত হয়। আজ এই গ্রন্থিটি আমাদের শরীরে মেলাটোনিন হরমোন তৈরি করে।
এটি একই হরমোন যা আমাদের ঘুম এবং জাগরণ চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে (Circadian Rhythm)। আপনার ঘুম আজ 600 মিলিয়ন বছর আগের সেই একচোখের প্রাণীর সাথে যুক্ত তা ভাবতেও মন খারাপ হয়।
এই গবেষণাটি প্রথমবারের মতো নিউরাল সার্কিটগুলির উত্স ব্যাখ্যা করেছে যা আমাদের রেটিনায় চিত্রগুলি বিশ্লেষণ করে।
বিজ্ঞানীরা সারা বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর আলো-সংবেদনশীল কোষ বিশ্লেষণ করেছেন এবং তাদের অবস্থান পরীক্ষা করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের চোখের পথটি একটি বিশেষ ‘চক্রপথ’ অর্থাৎ বাঁকা বাঁক অতিক্রম করেছে।
আমাদের সেই পূর্বপুরুষ যদি এক চোখ নিয়ে না জন্মাতেন তাহলে হয়তো আজ আমাদের চোখের গঠন ও দেখার ধরণ অন্যরকম হতো।