বিপদের ঘণ্টা: ‘মানুষের রক্তে বিষ দ্রবীভূত হচ্ছে’। CO2 এর মাত্রা বাড়ায় বদলে গেছে শরীরের রসায়ন! গবেষণায় উঠে এসেছে

নয়াদিল্লি: এখন পর্যন্ত সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান দূষণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা শুধুমাত্র আবহাওয়ার পরিবর্তন বা তাপ বৃদ্ধির ফলে দেখা যেত। কিন্তু নতুন এক গবেষণা সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। দ্য কিডস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অস্ট্রেলিয়া এবং কার্টিন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দাবি করেছেন যে বায়ুমণ্ডলে ক্রমবর্ধমান কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) এখন সরাসরি আমাদের রক্তে পৌঁছাচ্ছে। বিগত ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে মানুষের রক্তের রসায়নে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। এই পরিবর্তনগুলি এতটাই নীরব এবং ধীরগতির যে সাধারণ মানুষ তাদের সম্পর্কে অবগতও নয়। গবেষণা অনুসারে, কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা যদি এই হারে বাড়তে থাকে, তাহলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে আমাদের শরীরের রক্তের চিহ্নিতকারী তাদের সুস্থ সীমা অতিক্রম করবে। এর সবচেয়ে খারাপ প্রভাব পড়বে শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের উপর, কারণ তাদের শরীর এখনও বিকশিত হচ্ছে এবং তারা দীর্ঘ সময় ধরে এই বিষাক্ত বাতাসের সংস্পর্শে থাকবে।

রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে ভীতিকর পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়েছে

গবেষকরা আমেরিকার প্রায় ৭ হাজার মানুষের রক্তের নমুনা পরীক্ষা করেছেন। এই গবেষণাটি 1999 এবং 2020 সালের মধ্যে তথ্যের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। দেখা গেছে যে রক্তে ‘সিরাম বাইকার্বনেট’ এর মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে।

বাইকার্বোনেট একটি চিহ্নিতকারী যা শরীরে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ দেখায়। 1999 সালের তুলনায় এখন পর্যন্ত 7% বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।

আশ্চর্যের বিষয় হল যে বায়ুতে CO2 বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমাদের রক্তের গঠনও একই অনুপাতে পরিবর্তিত হচ্ছে। 2000 সালে, বায়ুমণ্ডলে CO2-এর মাত্রা ছিল 369 পিপিএম, যা আজ 420 পিপিএম-এর বেশি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে আমাদের শরীর এই পরিবর্তনশীল বাতাসের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তবে এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে ব্যয়বহুল হতে পারে।

কেন রক্তে বাইকার্বোনেট বৃদ্ধি শরীরের জন্য বিপজ্জনক?

  • বাইকার্বনেট আমাদের শরীরে অ্যাসিড এবং বেসের ভারসাম্য বজায় রাখতে কাজ করে। যখন আমরা বেশি CO2 শ্বাস নিই, তখন শরীর রক্তের pH ভারসাম্য রাখতে আরও বাইকার্বোনেট ধরে রাখতে শুরু করে। এটি এক ধরণের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, তবে এটি দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ভাল নয়।

অধ্যাপক আলেকজান্ডার লারকম্বের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, বাইকার্বনেটের মাত্রা আগামী 50 বছরে সুস্থ সীমার বাইরে চলে যাবে। এর প্রভাবে মানবদেহের অভ্যন্তরীণ কার্যাবলীর অবনতি ঘটতে শুরু করবে। এটি একটি বিশাল জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের অভাবের প্রকৃত কারণ কী?

এই গবেষণা সামনে এসেছে আরও একটি ভয়ঙ্কর তথ্য। রক্তে বাইকার্বনেটের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মাত্রা কমছে। এই দুটি উপাদানই আমাদের হাড় ও দাঁতের মজবুতির জন্য দায়ী।

গবেষকরা মনে করেন, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ মানবদেহে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস তাদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

মানুষ একটি বায়ুতে বিবর্তিত হয়েছিল যেখানে CO2 স্তর ছিল 280 থেকে 300 পিপিএম। কিন্তু গত এক দশকে তা প্রতি বছর ২.৬ পিপিএম হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। 2024 সালে, 3.5 পিপিএম এর রেকর্ড বৃদ্ধি দেখা গেছে। আমাদের অঙ্গগুলি এই দ্রুত পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত নয়।

কেন আমাদের শরীর এই বিষাক্ত বাতাস সহ্য করতে পারছে না?

ডঃ ফিল বিয়ারওয়ার্থ বলেছেন যে আমরা এই নতুন পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছি না। শরীরের একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রয়েছে যা বায়ু, রক্তের পিএইচ এবং শ্বাসের হারের মধ্যে কাজ করে। এখন বায়ুমণ্ডলে CO2-এর মাত্রা এত বেশি হয়ে গেছে যে ইতিহাসে মানুষ কখনও এটি অনুভব করেনি। এই গ্যাস এখন আমাদের শরীরের ভিতরে জমতে থাকে।

আমাদের বুঝতে হবে যে আমরা সম্ভবত এই বর্ধিত স্তরের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্য করতে সক্ষম হব না। তাই, কার্বন নিঃসরণ কমানো এখন শুধু পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য নয়, নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যও জরুরি হয়ে পড়েছে।

এমনকি শ্বাস নেওয়া কি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে?

এটা গবেষণা আমাদের সতর্ক করে যে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধুমাত্র তাপপ্রবাহ বা বন্যার লেন্স দিয়ে দেখা উচিত নয়। এটি আমাদের জীববিজ্ঞানকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য নীতিতে বাতাসের গুণমানের পাশাপাশি মানুষের রক্তের বায়োমার্কারগুলিও পর্যবেক্ষণ করা উচিত।

তবে এর মানে এই নয় যে মানুষ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়বে, তবে শরীরের এই ধীরগতির পরিবর্তন ভবিষ্যতে অনেক নতুন রোগের জন্ম দিতে পারে। আগামী প্রজন্মকে সুস্থ জীবন দিতে হলে অবিলম্বে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *